পিএসজি হতে পারে ক্লাব ফুটবলের রোল মডেল
- আপডেট সময় : ০৩:৩০:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৪৭ বার পড়া হয়েছে
তারকা খেলোয়াড় কেনার পাশাপাশি নিজেদের একাডেমি থেকে প্রতিভাবান ফুটবলার তুলে এনে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী দল গড়ার পরিকল্পনা করছে প্যারিস সেইন্ট জার্মেই (পিএসজি)। ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখা এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিয়মিত সাফল্য পাওয়ার লক্ষ্যে ফরাসি ক্লাবটি তরুণ খেলোয়াড়দের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। মূল দল ও যুবদলের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করে নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের পেশাদার পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার এই উদ্যোগ অন্য ক্লাবগুলোর জন্যও অনুসরণযোগ্য মডেল হয়ে উঠতে পারে।
আধুনিক ফুটবলে বড় ক্লাবগুলোর সাফল্যের পেছনে তারকা খেলোয়াড়দের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু দামি খেলোয়াড় কিনে দীর্ঘদিন সাফল্য ধরে রাখা কঠিন। সে কারণে ইউরোপের অনেক শীর্ষ ক্লাব নিজেদের একাডেমিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। পিএসজিও সেই পথেই হাঁটছে। ক্লাবটির লক্ষ্য, তরুণদের এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তাঁরা ভবিষ্যতে মূল দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠতে পারেন।
তরুণদের গড়ে তুলতে ইয়ুথ লিগে গুরুত্ব
পিএসজির একাডেমির ক্রীড়া পরিচালক ইয়োহান কাবায়ে মনে করেন, তরুণ ফুটবলারদের বিকাশে উয়েফা ইয়ুথ লিগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দৃষ্টিতে, এই প্রতিযোগিতা কেবল শিরোপা জয়ের মঞ্চ নয়; বরং তরুণ খেলোয়াড়দের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও কৌশলগত বোঝাপড়া বাড়ানোর একটি বড় সুযোগ।
ইয়ুথ লিগে বিভিন্ন দেশের শক্তিশালী যুবদলের বিপক্ষে খেলতে হয়। ফলে তরুণেরা ভিন্ন ধরনের খেলার কৌশল ও ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। প্রতিপক্ষের চাপ সামলানো, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কঠিন পরিস্থিতিতে সঠিক পাস দেওয়া কিংবা আক্রমণ গড়ে তোলার মতো বিষয়েও তাঁদের অভিজ্ঞতা বাড়ে।
এ ধরনের প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণ খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তা তৈরিতেও সহায়তা করে। কারণ, যুব পর্যায়ে ভালো পারফরম্যান্স করলেই পেশাদার ফুটবলে সফল হওয়া যায় না। বড় ম্যাচের চাপ, শারীরিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত শৃঙ্খলার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও জরুরি। পিএসজি তাই তরুণদের শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ দিচ্ছে না, বরং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিজেদের প্রমাণ করার পথও তৈরি করছে।
এক মৌসুমে মূল দলে সুযোগ পেয়েছেন ১০ তরুণ
পিএসজির একাডেমিকেন্দ্রিক পরিকল্পনার সুফল ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। গত মৌসুমে ক্লাবটির একাডেমি থেকে উঠে আসা ১০ জন ফুটবলার মূল দলের হয়ে অন্তত একটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের অভিষেক হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই খেলোয়াড়দের প্রত্যেকেরই উয়েফা ইয়ুথ লিগে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এই পরিসংখ্যান তরুণদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে একাডেমি ও যুব প্রতিযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে। যুব পর্যায়ে নিয়মিত খেলার সুযোগ পেলে খেলোয়াড়েরা নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারেন। এরপর ধাপে ধাপে মূল দলের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
২০২৬ সালে ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে সাফল্যের পাশাপাশি উয়েফা ইয়ুথ লিগের শেষ চারেও জায়গা করে নেয় পিএসজি। এসব অর্জন ক্লাবটির যুব উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়মিত উন্নয়ন এবং মূল দলে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে মূল দলে ওঠার সেতু এসপোয়ার
তরুণ ফুটবলারদের মূল দলে তুলে আনার প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে ২০২৪ সালে এসপোয়ার দল গঠন করে পিএসজি। অনূর্ধ্ব-১৯ দল থেকে পেশাদার মূল দলে ওঠার মধ্যবর্তী ধাপ হিসেবে কাজ করছে এই দল। এর মাধ্যমে তরুণ খেলোয়াড়দের বয়সভিত্তিক ফুটবল থেকে সিনিয়র পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অনূর্ধ্ব-১৬ থেকে অনূর্ধ্ব-২৩ বয়সী খেলোয়াড়দের নিয়মিত খেলার সুযোগ দিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাড়ানো এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। একাডেমির সব খেলোয়াড় একই গতিতে উন্নতি করেন না। কেউ অল্প বয়সেই উচ্চপর্যায়ের ফুটবলের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠেন, আবার কারও প্রয়োজন হয় আরও বেশি অনুশীলন ও ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা।
এসপোয়ার দল এই ব্যবধান কমাতে সাহায্য করছে। যেসব খেলোয়াড় অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন, তাঁরা এখানে আরও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পান। একই সঙ্গে মূল দলের জন্য প্রস্তুত হতে তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা, খেলার গতি এবং কৌশলগত দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
এই ধরনের মধ্যবর্তী দল গঠন তরুণ খেলোয়াড়দের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। এতে প্রতিভাবান ফুটবলারদের অল্প বয়সে মূল দলে তুলে এনে অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার ঝুঁকি কমে। আবার দীর্ঘদিন যুব পর্যায়ে আটকে থাকার কারণে তাঁদের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও কমে।
একাডেমি ও মূল দলের মধ্যে সমন্বয়
পিএসজির পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একাডেমি এবং মূল দলের মধ্যে সমন্বয়। শুধু ভালো ফুটবলার তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; তাঁদের ক্লাবের খেলার ধরন ও কৌশলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপযোগী করে তোলাও জরুরি।
ইয়োহান কাবায়ের মতে, খেলোয়াড়দের উন্নয়নে কোচ, বিশ্লেষক, পুষ্টিবিদ, ফিটনেস কোচ ও চিকিৎসকসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করেন। এর ফলে একজন খেলোয়াড়ের উন্নয়নকে শুধু মাঠের পারফরম্যান্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয় না। তাঁর শারীরিক সক্ষমতা, পুষ্টি, ফিটনেস, পুনর্বাসন এবং কৌশলগত বোঝাপড়ার দিকেও নজর দেওয়া সম্ভব হয়।
এ ছাড়া ক্লাবের সভাপতি নাসের আল-খেলাইফি, ক্রীড়া উপদেষ্টা লুইস কাম্পোস এবং প্রধান কোচ লুইস এনরিকেও এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। ক্লাবের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে মূল দলের কোচিং স্টাফ পর্যন্ত সমন্বয় থাকলে তরুণদের জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা সহজ হয়।
মূল দলের কোচরা একাডেমির খেলোয়াড়দের সক্ষমতা সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা পেতে পারেন। অন্যদিকে একাডেমির কোচরাও বুঝতে পারেন, পেশাদার ফুটবলে জায়গা পেতে একজন খেলোয়াড়ের কোন কোন ক্ষেত্রে উন্নতি প্রয়োজন। ফলে খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়া আরও লক্ষ্যভিত্তিক হয়ে ওঠে।
জায়ার-এমেরিদের হাত ধরে ভবিষ্যতের স্বপ্ন
পিএসজির একাডেমি থেকে উঠে আসা ওয়ারেন জায়ার-এমেরি, সেনি মায়ুলু ও ইব্রাহিম এমবায়েদের মতো তরুণদের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার সুযোগ পাওয়া ক্লাবটির পরিকল্পনার অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্লাব প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ পাওয়া তরুণদের জন্য বড় অভিজ্ঞতা।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো প্রতিযোগিতায় খেলার সময় প্রতিপক্ষের মান, ম্যাচের গতি এবং চাপের মাত্রা অনেক বেশি থাকে। এমন পরিবেশে খেলার সুযোগ তরুণদের দ্রুত পরিণত হতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের মাধ্যমে তাঁরা কোচিং স্টাফের আস্থা অর্জন করতে পারেন।
তবে তরুণদের মূল দলে সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু একাডেমি থেকে উঠে এসেছেন বলে কাউকে নিয়মিত খেলানোর সুযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। পারফরম্যান্স, অনুশীলনে অগ্রগতি, শারীরিক সক্ষমতা এবং দলের প্রয়োজনের ভিত্তিতে খেলোয়াড় নির্বাচন করতে হয়। পিএসজির সামনে তাই একদিকে তরুণদের বিকাশের সুযোগ তৈরি করা, অন্যদিকে শীর্ষ পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক ফল ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
তারকা নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই দল গঠনের পরিকল্পনা
আধুনিক ফুটবলে বড় ক্লাবগুলোর দলবদলের ব্যয় প্রায়ই আলোচনায় আসে। প্রতিষ্ঠিত তারকা খেলোয়াড় কিনতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের বেতন, চুক্তি এবং অন্যান্য খরচও ক্লাবের আর্থিক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলে। নিজেদের একাডেমি থেকে খেলোয়াড় তুলে আনতে পারলে এই ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
একাডেমির খেলোয়াড়দের সবাই যে মূল দলে জায়গা পাবেন, তা নয়। তবে নিয়মিত প্রতিভা তৈরি করতে পারলে ক্লাবের সামনে একাধিক বিকল্প থাকে। কেউ মূল দলের সদস্য হতে পারেন, কেউ অন্য ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। এভাবে দীর্ঘমেয়াদে খেলোয়াড় উন্নয়নের একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।
পিএসজির জন্যও এই পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শুধু তারকা খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের প্রতিভা কাজে লাগাতে পারলে দল গঠনে ভারসাম্য আনা সম্ভব। একই সঙ্গে ক্লাবের নিজস্ব ফুটবল দর্শন ও খেলার ধরন ধরে রাখা সহজ হতে পারে।
অন্য ক্লাবগুলোর জন্যও হতে পারে অনুসরণযোগ্য মডেল
পিএসজির উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একাডেমিকে মূল দলের বাইরে আলাদা কোনো প্রকল্প হিসেবে না দেখে পুরো ক্লাবের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তরুণদের প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার সুযোগ, মধ্যবর্তী দল গঠন এবং মূল দলের সঙ্গে সমন্বয়—সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে।
অন্য ক্লাবগুলোও নিজেদের আর্থিক সামর্থ্য, ফুটবল সংস্কৃতি এবং খেলোয়াড় উন্নয়নের প্রয়োজন অনুযায়ী এই মডেলের বিভিন্ন দিক অনুসরণ করতে পারে। তবে এ ধরনের পরিকল্পনার ফল পেতে সময়, দক্ষ কোচিং স্টাফ, উন্নত প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং তরুণদের প্রতি ধারাবাহিক আস্থা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে পিএসজির লক্ষ্য শুধু চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জেতা নয়; বরং নিয়মিত প্রতিভাবান ফুটবলার তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী দল গড়ে তোলা। একাডেমি থেকে মূল দলে খেলোয়াড় তুলে আনার এই প্রক্রিয়া সফলভাবে ধরে রাখতে পারলে ফরাসি ক্লাবটি ক্লাব ফুটবলে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। তারকা কেনার পাশাপাশি নিজস্ব প্রতিভা গড়ে তোলার এই কৌশল ভবিষ্যতে পিএসজিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে এবং অন্য ক্লাবগুলোর জন্যও অনুসরণযোগ্য রোল মডেল হয়ে উঠতে পারে।

























