৩ বছরে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা নথিভুক্ত
- আপডেট সময় : ০১:০৯:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৪৩ বার পড়া হয়েছে
জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য ডার্কওয়েবে ফাঁস ও কেনাবেচা ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ডার্ক ওয়েব মনিটরিং টুলস ও সফটওয়্যার কেনার পরিকল্পনা করেছে সংস্থাটি।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে দেশে একাধিক তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ফাঁসের বিষয়টিও রয়েছে। ফাঁস হওয়া তথ্য ডার্কওয়েব থেকে সংগ্রহ করে পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ কারণে এনআইডির তথ্যের নিরাপত্তা জোরদারে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডার্কওয়েবে এনআইডির তথ্য কেনাবেচার অভিযোগ
ইসি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনআইডির তথ্য বিক্রির জন্য বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজ ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্ল্যাটফর্মে পাওয়া তথ্যের একটি বড় অংশ ডার্কওয়েব থেকে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ডার্কওয়েব থেকে তুলনামূলক বেশি দামে তথ্য কিনে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রম ঠেকাতে এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন।
ইতোমধ্যে এনআইডির তথ্য কেনাবেচার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ বন্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব কার্যক্রমের উৎস শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত নজরদারি চালানো হচ্ছে।
২ কোটি টাকার মনিটরিং সফটওয়্যার
ডার্কওয়েবে নজরদারি বাড়ানোর অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশনের বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনায় ডার্ক ওয়েব মনিটরিং টুলস ও সফটওয়্যারের জন্য ২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশা বলেন, ডার্কওয়েবে নজরদারি বাড়ানোর বিষয়টি চলমান। তথ্য ফাঁস ঠেকাতে শুধু সফটওয়্যার ব্যবহারই নয়, আরও বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ইসির সচিব আখতার আহমেদের স্বাক্ষরিত বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনায় এনআইডি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম কেনার তথ্যও রয়েছে।
আইসিটি খাতে প্রায় ৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা
ইসির আইসিটি সিস্টেম সাপোর্ট শাখার ক্রয় পরিকল্পনায় ডেটা সেন্টারের রক্ষণাবেক্ষণে ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। আইসিটি সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণে ২০ লাখ টাকা এবং অ্যান্টিভাইরাস, নেটওয়ার্ক ডিভাইস লাইসেন্সিং ও সহায়তায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ভিপিএন স্থাপন ও টিবিএল ব্যবহারে ২০ লাখ টাকা এবং নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্থাপনে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।
সব মিলিয়ে আইসিটি সিস্টেম সাপোর্ট শাখার এসব খাতে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
এনআইডি উইংয়ের জন্য আরও যেসব ব্যয়
জাতীয় পরিচয়পত্র-সংশ্লিষ্ট কাজে কম্পিউটার সফটওয়্যার ও অন্যান্য সামগ্রী কেনায় ২০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। ডার্ক ওয়েব মনিটরিং টুলস ও সফটওয়্যারের জন্য রাখা হয়েছে ২ কোটি টাকা।
এ ছাড়া এনআইডি মোবাইল অ্যাপ তৈরিতে ৫ লাখ, ক্লাউড এআইয়ে ৩ লাখ এবং ইকেওয়াইসি সফটওয়্যারে ৫ লাখ টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
অফিস স্টেশনারিতে ১০ লাখ, নিরাপত্তা পরীক্ষা বা ভিএপিটিতে ৩০ লাখ, এনআইডি নিবন্ধনের ল্যাপটপে ৩ লাখ, কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামে ৪০ লাখ এবং অফিস সরঞ্জাম ও ফার্নিচারে ১৬ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।
সব মিলিয়ে এনআইডি উইংয়ের ক্রয় পরিকল্পনার পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
শুধু সফটওয়্যারেই সমাধান হবে না
ডার্ক ওয়েব মনিটরিং সফটওয়্যার এনআইডির তথ্য ফাঁস ঠেকাতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা দক্ষ জনবলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।
কম্পিউটার নেটওয়ার্ক প্রকৌশলী সৈয়দ জাহিদ হোসেনের মতে, ডার্ক ওয়েব মনিটরিংয়ের জন্য বিশ্বে কার্যকর অনেক সফটওয়্যার রয়েছে। তবে এসব সফটওয়্যার পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল প্রয়োজন।
তার মতে, তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি শনাক্ত করতে সার্বক্ষণিক সফটওয়্যারের ওপর নজর রাখতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে। দক্ষ জনবল না থাকলে শুধু মনিটরিং সফটওয়্যার দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
দেশে বেড়েছে তথ্য ফাঁসের ঘটনা
তথ্যপ্রযুক্তি-বিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (টিজিআই) ‘ব্রিচড অ্যান্ড আনআনসার্ড: বাংলাদেশ’স ডেটা ব্রিচ এপিডেমিক (২০২৩–২০২৬)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশে তথ্য ফাঁসের চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬টি সরকারি এবং ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
টিজিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৭টি, ২০২৪ সালে ২৭টি এবং ২০২৫ সালে ১৪টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে আরও ২০টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঘটনা ১৩টি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঘটনা ৭টি।
এনআইডির তথ্য সুরক্ষায় বাড়ছে নজরদারি
টিজিআইয়ের প্রতিবেদনে ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে নির্বাচন কমিশন-সংশ্লিষ্ট অন্তত পাঁচটি তথ্য ফাঁসের ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের জাতীয় তথ্যভান্ডারে সরাসরি অনুপ্রবেশের প্রমাণ পাওয়া না গেলেও তৃতীয় পক্ষের যাচাইব্যবস্থা ও প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঘাটতি রয়েছে।
এ অবস্থায় এনআইডির তথ্য ফাঁস ও অবৈধ কেনাবেচা ঠেকাতে ডার্কওয়েবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নতুন মনিটরিং সফটওয়্যার ব্যবহারের পাশাপাশি দক্ষ জনবল ও অন্যান্য নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।




















