বেসরকারী খাতে সার আমদানীর বিরোধীতা করে ভেজাল ও নিম্নমানের সার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে সার আমদানী অনুমতি
- আপডেট সময় : ০৪:০১:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬
- / ১৫৭১ বার পড়া হয়েছে
বেসরকারী খাতে সার আমদানীর বিরোধীতা করে কৃষি মন্ত্রীকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে স্বয়ং কৃষি মন্ত্রীর একান্ত সচিব (সংযুক্ত) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ উইংয়ের যুগ্ম সচিব মোঃ খোরশেদ আলম। কৃষি মন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহনের পর সার সংক্রান্ত বিষয়ে বুঝে উঠার আগেই তড়িগড়ি করে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য এবারও চীন থেকে ৪ লক্ষ ৪০ হাজার মেক্ট্রিক টন নন ইউরিয়া সার আমদানির জন্য চীনের ভেজাল ও নিম্নমানের সার সরবরাহকারী বেসরকারি সেই প্রতিষ্ঠান বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেডকে জিটুজির নামে চায়না থেকে সার আমদানির চুক্তি অনুমোদন করে দিয়েছে কৃষি মন্ত্রীর একান্ত সচিব (সংযুক্ত) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ উইংয়ের যুগ্ম সচিব মোঃ খোরশেদ আলম। কৃষি মন্ত্রীর অজান্তে বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বিগত বছরের মতো এবারও বেসরকারী খাতে সার আমদানীর বিরোধীতা করে জিটুজির নামে চায়না থেকে ভেজাল ও নিম্নমানের সার আমদানির অনুমতিপত্র অনুমোদন করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএডিসি) পাঠিয়েছে কৃষি মন্ত্রনালয়ের এই প্রভাবশালী মহল।
মন্ত্রীর অনুমোদনের পত্রে উল্লেখ করেন যে, চীনের বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেডের নামীয় প্রতিষ্ঠানটি ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখ বিএডিসি’র মাধ্যমে জিটুজি চুক্তির আওতাড ডিএপি সার সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করে। সে প্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (২০২৩ সালের ২৮তম সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক) ৩ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখ হতে উক্ত প্রতিষ্ঠানের নিকট হতে ডিএপি সার আমদানির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৩০ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখ উভয় দেশের মধ্যে চুক্তি সম্পাদন করা হয়। সে আলোকে উক্ত চুক্তির আওতায় সার আমদানি করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ গত ১০ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখ বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেডের চীন ও বিএডিসি’র মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির আওতায় ৪.৪০ লক্ষ মে:টন ( নিশ্চিত ২.৮০, ঐচ্ছিক ১.৬০) ডিএপি সারের মধ্যে ৭টি নিশ্চিত লটের ২.৮০ লক্ষ মে: টন সার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আমদানি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ঐচ্ছিক লটের অবশিষ্ট সার আমদানি করার সুযোগ নেই। তবে উক্ত প্রতিষ্ঠান হতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১১টি লটে ৪.৪০ লক্ষ মে:টন ( নিশ্চিত ২.৮০, ঐচ্ছিক ১.৬০) ডিএপি সার সরবরাহের নিমিত্ত খসড়া চুক্তি পাওয়া গেছে। উক্ত খসড়া চুক্তি মন্ত্রণালয় কর্তৃক ০১/০৪/২০২৬ তারিখ অনুমোদন করে পরবর্তী প্রয়োাজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য বিএডিসিকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। সে মোতাবেক চুক্তি সম্পাদনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
জানা গেছে, চীনা ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সারে ১৮% নাইট্রোজেন ও ৪৬% ফসফেটসহ মোট ৬৪% উপাদান থাকার কথা এলসিতে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেড যেকোনো প্রতিষ্ঠান থেকে সার আমদানির অনুমতি দেওয়ায় তারা ৬৪% মানের সারের সঙ্গে ৫৭% মানের ডিএপি সার মিশিয়ে রাতের অন্ধকারে জাহাজে লোড করেছে। এই ৫৭% সারের মধ্যে রয়েছে ৪৩% ফসফেট ও ১৪% নাইট্রোজেন। ডিএপি সারে নাইট্রোজেন ও ফসফেট ৬৪% হিসেবে চীন থেকে আমদানিকৃত প্রতি মেট্রিক টন সারের মূল্য, জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য খরচসহ ৮৯০ থেকে ৮৯৫ মার্কিন ডলার। কিন্তু প্রতি মেট্রিক টনে ৭% নাইট্রোজেন ও ফসফেট কম দেওয়ায় প্রতিটন সারের মূল্য কমে যায় প্রায় ১০০ মার্কিন ডলার।
সূত্রটি আরও জানায়, চীনের বেসরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ৩ থেকে ৪ ধরনের গ্রেডের ডিএপি সার উৎপাদন করে। এ কারণেই ৬৪% মানের সারের সঙ্গে ৫৭% মানের সার মেশানো সহজ হচ্ছে। আমদানিকৃত সার জাহাজীকরণের সময় চীনের স্থানীয় কোম্পানি বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেড প্রতি ৪০ হাজার মেট্রিক টন সারের মধ্যে ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন নিম্নমানের সার মিশ্রণ করে জাহাজে লোড দিয়েছে। প্রথমে জাহাজের নিচে নিম্নমানের সার এবং তার উপরে বালো সার লোড করে।
গত ৩০ অক্টোবর চীন থেকে ৪৪ হাজার মেট্রিক টনের আরও তিনটি জাহাজে করে নিম্নমানের সার নিয়ে আসে। সে সময় সরকারের উচিত ছিল চীন থেকে নিম্নমানের সার নিয়ে আসা জাহাজের সার আনলোডিং বন্ধ করা। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব ও সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের একান্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমাম, সাবেক যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী নাজমুল হাসান পাপনের আস্থাভাজন, ভৈরবের সাবেক ইউএনও এবং বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ উইংয়ের যুগ্ম সচিব ও কৃষি মন্ত্রীর একান্ত সচিব (সংযুক্ত) মোঃ খোরশেদ আলম এবং সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের একান্ত সচিব বর্তমান উপ সচিব মোঃ মনিরুজ্জামানের কারনেই চীন থেকে নিম্নমানের সার নিয়ে আসা জাহাজের সার আনলোডিং বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
বিএডিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নিম্নমানের সার দেশে আসার মূল কারণ হলো কন্টিনেন্টাল ইন্সপেকশন কোং (বিডি) লিমিটেড নামের একটি অখ্যাত ও নিম্নমানের বাংলাদেশি কোম্পানিকে পরিদর্শনের দায়িত্ব দেওয়া। এ কোম্পানি এলসির ক্লজ অনুযায়ী সারের নাইট্রোজেন ও ফসফেটের পরিমাণ এবং গুণগত মান যাচাই করে সার্টিফিকেট দেয়। এই সার্টিফিকেটের ভিত্তিতেই রপ্তানিকারক ব্যাংক থেকে বিল উত্তোলন করে। কিন্তু সাধারণত এমন আমদানিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান যেমন এসজিএস (আমেরিকা) বা ইন্সপেক্টরেট দ্বারা গুণগতমান পরীক্ষার কথা থাকলেও, গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকের দেওয়া এলসিতে কন্টিনেন্টাল ইন্সপেকশন কোং (বিডি) লিমিটেড নামের এই প্রতিষ্ঠানটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে এই চক্রটি এলসির মাধ্যমে দেদারছে অর্থ পাচার করে নিয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে রাষ্ট্রীয়ভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়ে জিটুজি পদ্ধতিতে সেই দেশের সরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সার আমদানি করে থাকে। কিন্তু সার আমদানির পরিপত্রের সকল নিয়ম-নীতিকে উপেক্ষা করে বিগত ২০২৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জিটুজি চুক্তির নামে চীনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেডের সাথে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। প্রথম বছর বিএডিসি ওই প্রতিষ্ঠানটিকে রপ্তানিকারক হিসেবে দেখিয়ে চীনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউয়া এবং শ্যাং ফ্যাং নামক দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে নিম্নমানের সার ক্রয় করে বাংলাদেশে পাঠায়। চুক্তি অনুযায়ী, সেই দেশের কোনো বেসরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা ট্রেডিং কোম্পানির কাছ থেকে সার আমদানি করার কোনো সুযোগ নেই। প্রতি বছর বেসরকারি খাতে সার আমদানি দরপত্র আহবান হয় মে মাসের প্রথম সপ্তাহে । কিন্তু ২০২৫ সালে দরপত্র আহবান করে দুই মাস পর জুলাই মাসে শেষের দিকে। সে সময় সবচেয়ে লক্ষনীয় বিষয় যে জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য প্রতি টন ১৫০-২০০ ডলার বেড়ে যায় শুধুমাত্র এপ্রিল মাসে দরপত্র আহবান না করায়। প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা বেশি খরচ করে সার আমদানি করে কৃষি মন্ত্রণালয়। গত বছর সার আমদানি সংক্রান্ত পরিপত্রের নিয়ম-কানুনকে কোনো প্রকার তোয়াক্কা না করে জিটুজি পদ্ধতিতে চীনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেডের মাধ্যমে ভেজাল ও নিম্নমানের সার আমদানি করে রাষ্ট্রের প্রায় এক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্রটি।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানাগেছে, দেশে প্রথম বিএনপি সরকারই বিগত ২০০৪-২০০৫ অর্থবছর থেকেই শুরু করে ভর্তুকির আওতায় ইউরিয়া ও নন ইউরিয়া সার আমদানি ও বিতরণ। ইউরিয়া সার আমদানি ও বিতরণ সম্পূর্ণ কার্যক্রম সম্পন্ন করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি )। এছাড়া নন ইউরিয়া সার (টিএসপি, ডিএপি, এমওপি) আমদানি করে দুই ভাবে প্রথমত বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মাধ্যমে সরকার টু সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে এবং দ্বিতীয়ত বেসরকারি আমদানিকারকে মাধ্যমে। ২০০৪-০৫ সালে দেশের মোট চাহিদার ২০% সার আমদানি করছে বিএডিসি এবং বেসরকারিভাবে আমদানি হয়েছে ৮০% সার। বর্তমানে বিএডিসি আমদানি করছে ৭০% সার এবং বেসরকারিভাবে আমদানি হয় ৩০% সার।
গত ৩০ অক্টোবর চীন থেকে ৪৪ হাজার মেট্রিক টনের আরও তিনটি জাহাজ নিম্নমানের সার নিয়ে আসে। সে সময় সরকারের উচিত ছিল চীন থেকে নিম্নমানের সার নিয়ে আসা জাহাজের সার আনলোডিং বন্ধ করা। নিম্নমানের সার দেশে আসার মূল কারণ হলো কন্টিনেন্টাল ইন্সপেকশন কোং (বিডি) লিমিটেড নামের একটি অখ্যাত ও নিম্নমানের বাংলাদেশি কোম্পানিকে পরিদর্শনের দায়িত্ব দেওয়া। এ কোম্পানি এলসির ক্লজ অনুযায়ী সারের নাইট্রোজেন ও ফসফেটের পরিমাণ এবং গুণগত মান যাচাই করে সার্টিফিকেট দেয়। এই সার্টিফিকেটের ভিত্তিতেই রপ্তানিকারক ব্যাংক থেকে বিল উত্তোলন করে। কিন্তু সাধারণত এমন আমদানিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান যেমন এসজিএস (আমেরিকা) বা ইন্সপেক্টরেট দ্বারা গুণগতমান পরীক্ষার কথা থাকলেও, গত ২৫ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকের দেওয়া এলসিতে কন্টিনেন্টাল ইন্সপেকশন কোং (বিডি) লিমিটেড নামের এই প্রতিষ্ঠানটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে এই চক্রটি এলসির মাধ্যমে দেদারছে অর্থ পাচার করছে।





















