ফেনীর নুসরাত হত্যা: হাইকোর্টে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল
- আপডেট সময় : ১২:৫৫:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৭৯৩ বার পড়া হয়েছে
ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে চার আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মামলার অপর ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে এ রায় ঘোষণা করেন।
যাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল
হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম।
অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া চার আসামি হলেন নুর উদ্দিন, সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের ও উম্মে সুলতানা পপি।
এ ছাড়া মামলার ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন রুহুল আমিন, মাকসুদুল আলম, হাফেজ আবদুল কাদের, আফসার উদ্দিন, কামরুন নাহার মণি, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহিউদ্দিন শাকিল।
কী ঘটেছিল নুসরাতের সঙ্গে
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে যান নুসরাত জাহান রাফি। সেদিন তাকে পরীক্ষাকেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় প্রথমে তাকে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় নুসরাত মারা যান।
এর আগে ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ নুসরাতের মা শিরীন আখতার মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে মামলা করেছিলেন। ওই মামলায় সিরাজকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে মামলার তদন্তে উঠে আসে।
নুসরাতের মৃত্যুর পর তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল সোনাগাজী থানায় হত্যা মামলা করেন।
দ্রুত শেষ হয় বিচার
তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ২৮ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর মামলায় ৮৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়।
মাত্র ৬১ কার্যদিবসে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ করে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর রায় ঘোষণা করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়।
হাইকোর্টে আসে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল
বিচারিক আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড হলে তা কার্যকর করার আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এ কারণে ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদনের জন্য মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে।
পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা নিজেদের সাজা বাতিল বা কমানোর জন্য আপিল ও জেল আপিল করেন। এসব আবেদনের ওপর হাইকোর্টে দীর্ঘ শুনানি হয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন এবং হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে প্রধান বিচারপতি গত ১০ জুন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন করেন। ওই বেঞ্চেই নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি হয়।
গত ২০ আগস্ট মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষ হয়। পরে রায় ঘোষণার জন্য ২৪ আগস্ট দিন নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত দিনেই হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেন।
নতুন রায়ে বদলে গেল ১৬ আসামির সাজা
২০১৯ সালের বিচারিক আদালতের রায়ে যেখানে ১৬ জনেরই মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল, হাইকোর্টের রায়ে সেই সাজায় বড় পরিবর্তন এসেছে। দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
হাইকোর্টের এই রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামির ক্ষেত্রে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী আপিলের সুযোগ থাকায় মামলাটির পরবর্তী ধাপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদ সৃষ্টি হয়েছিল। দ্রুত বিচার শেষ করে ২০১৯ সালে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনাটিও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। সাত বছর পর হাইকোর্টের রায়ে মামলাটির দণ্ড কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এল।























