দুর্ভোগে তিন উপজেলার মানুষ
সোনাগাজীতে দুই যুগেও নির্মিত হয়নি কাজীর হাট স্লুইসগেট
- আপডেট সময় : ০৪:৩২:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৬৪০ বার পড়া হয়েছে
ফেনীর সোনাগাজীতে ছোট ফেনী নদীতে বিলীন হওয়ার দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও পুনর্নির্মাণ করা হয়নি কাজীর হাট স্লুইসগেট। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সোনাগাজী, কোম্পানীগঞ্জ ও দাগনভূঞা উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে একটি সেতু কিংবা নতুন স্লুইসগেট নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই দাবি বাস্তবায়িত হয়নি।
বর্তমানে তিন উপজেলার মানুষের নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা একটি নৌকা। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই নৌকায় নদী পার হচ্ছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি ব্যয় হচ্ছে। পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬১ সালে ছোট ফেনী নদীর ওপর ২০ ভেন্টবিশিষ্ট কাজীর হাট স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ত পানির ক্ষতি থেকে কৃষিজমি রক্ষা করা ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে সোনাগাজী, কোম্পানীগঞ্জ ও দাগনভূঞা উপজেলার মানুষের যোগাযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি।
কিন্তু ২০০২ সালে জোয়ারের পানির প্রবল চাপে স্লুইসগেটটি ছোট ফেনী নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এরপর কেটে গেছে প্রায় ২৪ বছর। স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন সময় আন্দোলন, মানববন্ধন ও দাবি-দাওয়া জানালেও সেখানে নতুন কোনো স্লুইসগেট কিংবা সেতু নির্মাণ করা হয়নি।
নৌকাই এখন তিন উপজেলার মানুষের একমাত্র ভরসা
স্লুইসগেটটি বিলীন হওয়ার পর থেকে নদীর দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে একটি নৌকার মাধ্যমে মানুষকে নদী পার হতে হয়। এ জন্য গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি ও স্রোত বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। কৃষকদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নেওয়া এবং ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনেও নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। ফলে এলাকার স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে।
নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও বসতবাড়ি
কাজীর হাট স্লুইসগেট বিলীন হওয়ার পর শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থারই ক্ষতি হয়নি, নদীভাঙনের কারণে এলাকার কৃষি ও বসতভিটাও হুমকির মুখে পড়েছে। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বহু ফসলি জমি ও বসতবাড়ি।
নদীর দুই পাশে রয়েছে দুটি গুচ্ছগ্রাম। এ ছাড়া আশপাশে রয়েছে একাধিক মসজিদ, স্কুল ও মাদরাসা। সেতু বা স্লুইসগেট না থাকায় এসব এলাকার মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে রাতের বেলা কিংবা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নৌকায় নদী পারাপার আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে শিশু, নারী ও বয়স্কদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।
আন্দোলন করেও মেলেনি প্রতিকার
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কাজীর হাটে সেতু অথবা স্লুইসগেট নির্মাণের দাবি জানানো হচ্ছে। এ নিয়ে তিন উপজেলার মানুষ বিভিন্ন সময় আন্দোলন-সংগ্রামও করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার দাবি তুলে ধরলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
তাদের মতে, এখানে শুধু একটি সেতু নির্মাণ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নদীর গতিপ্রকৃতি, ভাঙন রোধ, পানি নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিজমি সুরক্ষার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্লুইসগেট অথবা এলাকার উপযোগী একটি সেতু নির্মাণ জরুরি।
দ্রুত নির্মাণের আশ্বাস মন্ত্রীর
চরদরবেশ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, কাজীর হাট স্লুইসগেট পুনর্নির্মাণের দাবিতে তিন উপজেলার বাসিন্দারা বহুবার আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিষয়টি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে সেখানে সেতু কিংবা রেগুলেটর নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মন্ত্রীর দেওয়া আশ্বাস দ্রুত বাস্তবে রূপ নেবে। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবেন তিন উপজেলার মানুষ। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধ ও কৃষিজমি সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দুই যুগ ধরে একটি নদী পার হতে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে। এখন স্থানীয়দের একটাই প্রশ্ন—কবে নির্মিত হবে কাজীর হাট স্লুইসগেট? কবে শেষ হবে তাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ?




















