বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব
- আপডেট সময় : ১২:৩০:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৫১ বার পড়া হয়েছে
আনন্দ, উচ্ছ্বাস, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য আর বিদায়ের করুণ সুরের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পাঁচ দিনব্যাপী এই আয়োজন। বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপগুলোতে ভক্তদের ঢল নামে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বামী মহাদেবের আবাস কৈলাসে ফিরে যান। আগামী শরৎকালে আবারও তিনি ধরণীতে ফিরে আসবেন—এই প্রত্যাশা নিয়ে দেবীকে বিদায় জানান ভক্তরা।
দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায়
পূজার আনুষ্ঠানিকতা অনুযায়ী, বুধবার সকালে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান ভক্তরা। পরে সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে ভক্তরা দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একই সঙ্গে আগামী বছর আবারও দেবীর আগমনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তাঁরা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য শুধু প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের মনের কাম, ক্রোধ, হিংসা, লোভ ও লালসার মতো আসুরিক প্রবৃত্তি বিসর্জন দেওয়াও এই দিনের অন্যতম শিক্ষা। এসব নেতিবাচক প্রবৃত্তি ত্যাগ করে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করার মধ্য দিয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়।
বর্ণাঢ্য বিজয়া শোভাযাত্রা
এর আগে দুপুরে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির যৌথ উদ্যোগে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য বিজয়া শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রায় অংশ নিতে দুপুরের পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা পলাশীর মোড়ে জড়ো হতে থাকেন।
পরে শত শত ট্রাকে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রাটি সদরঘাটের উদ্দেশে যাত্রা করে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রাটি শহীদ মিনার, হাইকোর্ট, পুলিশ সদর দপ্তর, গোলাপ শাহ মাজার ও কোর্ট এলাকা ঘুরে সদরঘাটে পৌঁছায়।
এ সময় সড়কের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতি দেখা যায়। বিভিন্ন বয়সী মানুষ শোভাযাত্রা উপভোগ করেন। ঢাকের বাদ্য, ধর্মীয় সংগীত ও উৎসবমুখর পরিবেশে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক মুখর হয়ে ওঠে।
বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে প্রতিমা বিসর্জন
শোভাযাত্রা শেষে একে একে বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। একই সময়ে তুরাগ নদীতেও চলে বিসর্জন পর্ব। প্রতিমা বিসর্জনের সময় ভক্তদের মধ্যে একদিকে ছিল উৎসবের আনন্দ, অন্যদিকে ছিল প্রিয় দেবীকে বিদায় জানানোর আবেগ।
বিসর্জনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরাপত্তা জোরদার করে। সড়কে পুলিশ এবং নদীতে নৌপুলিশের টহল ছিল। পাশাপাশি যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করেন।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে যান চলাচল ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তাকর্মীদের তৎপরতা দেখা যায়। পূজা উদযাপন কমিটির স্বেচ্ছাসেবকেরাও বিসর্জন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করেন।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ব্যতিক্রমী আয়োজন
দেশের অধিকাংশ পূজামণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হলেও ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের প্রতিমাটি রেখে দেওয়া হয়। সেখানে পূজার কাজে ব্যবহৃত দেবীর ফুল, বেলপাতা ও ঘট বিসর্জন দেওয়া হয়।
প্রথা অনুযায়ী, বিসর্জনের পর সেখান থেকে শান্তিজল সংগ্রহ করে মঙ্গলঘটে রাখা হয়। ভক্তরা এই শান্তিজলকে মঙ্গল ও কল্যাণের প্রতীক হিসেবে হৃদয়ে ধারণ করেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, আগামী বছর এই শান্তিজল আবারও ঘট ও প্রতিমার পূজায় ব্যবহার করা হবে।
অন্যদিকে, রামকৃষ্ণ মিশনে সন্ধ্যা আরতির পর মিশনের পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। পরে ভক্তরা শান্তিজল গ্রহণ করেন এবং মিষ্টিমুখের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
৩৩ হাজার ৮৫১ মণ্ডপে দুর্গাপূজা
এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। উৎসব নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের পাশাপাশি পূজা উদযাপন কমিটিগুলোও নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে।
বিভিন্ন মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়। পূজার দিনগুলোতে মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় সামাল দেওয়া এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থানে ছিল। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজার সমাপ্তি ঘটে।
সম্প্রীতি ও শান্তির বার্তা
দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়।
দেবী দুর্গার বিদায়ের মধ্য দিয়ে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব শেষ হলেও ভক্তদের মনে রয়ে যায় আগামী বছর আবারও দেবীর আগমনের প্রত্যাশা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি অন্যায়, হিংসা ও বিদ্বেষ পরিহার করে শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়েই বিজয়া দশমীর তাৎপর্য ধারণ করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।




















