সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড, খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু
- আপডেট সময় : ০৪:৩০:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৮৫ বার পড়া হয়েছে
সৌদি আরবের মক্কায় প্রবাসী বাংলাদেশি যুবক নজরুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিরামপুর গ্রামের একটি পরিবারে। পরিবারের অভিযোগ, তাঁদের না জানিয়েই গত ১৪ অক্টোবর নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকলেও কী কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তা এখনো স্পষ্টভাবে জানতে পারেনি পরিবার। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তাঁর ফুফু আবেদা বেগম।
নিহত নজরুল ইসলাম (২৫) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিরামপুর গ্রামের আব্দুল বাছিরের বড় ছেলে। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। চার সন্তানের মধ্যে বড় ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা তাঁর মা-বাবা। একদিকে সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে বিদেশে পাঠাতে নেওয়া ঋণের বোঝা—সব মিলিয়ে অসহায় অবস্থায় দিন কাটছে পরিবারটির।
পরিবারের দাবি, গ্রেপ্তারের কারণ এখনো অজানা
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর মক্কা নগরীর একটি মসজিদে সুইটি আক্তার নামে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুল ও ওই তরুণীকে গ্রেপ্তার করে সৌদি পুলিশ। এরপর থেকে কারাগারে ছিলেন নজরুল।
পরিবার জানায়, কারাগারে থাকা অবস্থায় প্রতি রোববার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতেন নজরুল। তবে তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলার বিস্তারিত তথ্য কিংবা বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের। গত বুধবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে তাঁরা নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানতে পারেন।
পরিবারের আরও অভিযোগ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি নজরুল। তবে এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
ছেলের শোকে কাঁদছেন মা, ঋণের চাপে বাবা
নজরুলের মা রহিমা বেগম ছেলের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। স্বজনদের দাবি, ভাতিজার মৃত্যুর খবর সহ্য করতে না পেরে বুধবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আবেদা বেগম।
নজরুলের বাবা আব্দুল বাছির বলেন, ‘আমার ছেলে কী কারণে জেলে ছিল, তা এখনো জানি না। হঠাৎ ফেসবুকে তার মৃত্যুর খবর দেখতে পাই। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলাম। যাওয়ার ছয় মাস পর থেকেই সে জেলে ছিল। এর মধ্যে দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। এখন ঋণদাতারাও চাপ দিচ্ছেন।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার ছেলের মরদেহ দেশের মাটিতে ফিরে পেতে চাই। আমার ছেলে যদি বিনা কারণে মৃত্যুদণ্ড পেয়ে থাকে, তাহলে এর বিচার চাই।’
সরকারের কাছে তথ্য উদ্ঘাটনের দাবি
নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে গ্রামের মানুষ তাঁদের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন। পাশাপাশি নজরুলের মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ কামনা করছেন তাঁরা।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি গাজী নিয়াজুল করিম বলেন, ‘নজরুলকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, এমন অপরাধ সে করেছে বলে মনে করি না। সরকারের কাছে আবেদন, সৌদি আরবের সঙ্গে যোগাযোগ করে সঠিক তথ্য উদ্ঘাটন করা হোক। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের যথেষ্ট অবহেলা রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। দূতাবাস যোগাযোগ করলে হয়তো এমন পরিস্থিতি হতো না।’
তিনি আরও দাবি করেন, সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার এক নাগরিকের একই ধরনের সাজা হওয়ার পর দেশটির দূতাবাস উদ্যোগ নিয়ে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে নিয়েছিল বলে তিনি জানতে পেরেছেন। অথচ নজরুলের পরিবারের সঙ্গে এখন পর্যন্ত কেউ যোগাযোগ করেননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
গ্রামের বাসিন্দা রাহাত ও মাইনুদ্দিন বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাঁরা। একই সঙ্গে অসচ্ছল কৃষক পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
মরদেহ দেশে এলে সহায়তার আশ্বাস
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো আবেদন করা হয়নি। মরদেহ দেশে এলে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা করা হবে।’
নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তাঁর পরিবারের মধ্যে এখনো শোক ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। মামলার বিস্তারিত তথ্য, বিচারপ্রক্রিয়া এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনেরা।

























