সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণ ও দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্ত চায় জামায়াত
- আপডেট সময় : ০৩:০০:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৪৭ বার পড়া হয়েছে
দেশে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, দীর্ঘদিনের সার ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মী, সংসদ সদস্যদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও আত্মীয়স্বজনকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও দলীয় প্যাডে তৈরি তালিকা অনুযায়ী ডিলার নিয়োগের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেছে দলটি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
সার ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
ব্রিফিংয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণে চরম অব্যবস্থাপনা এবং দলীয়করণ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও ভোগান্তি বাড়ছে। একই সঙ্গে কৃষি খাত, প্রশাসনের নৈতিকতা এবং নাগরিকদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, সার আমদানি, উৎপাদন, বিতরণ, ব্যবহার ও ডিলার নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। এসব কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করা প্রয়োজন। কিন্তু ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে সেই নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে প্রণীত রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬ এবং এর অধীন অ্যালোকেশন অব বিজনেস অনুযায়ী সারসংক্রান্ত বিষয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। এ বিষয়ে আগে একাধিকবার নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশোধন করা হয়েছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও সার ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত নীতিমালা ছিল। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারও নীতিমালা সংশোধন করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন
সারসংক্রান্ত বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর অভিযোগ, কৃষি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়ে অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির বক্তব্য ও হস্তক্ষেপ দায়িত্বের সীমা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে বিভিন্ন কাজের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের প্রবণতা প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য উদ্বেগজনক।
মনিটরিং কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ
সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে উপজেলা ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ তুলেছে জামায়াত। মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, এসব কমিটিতে রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব বেড়েছে। এর ফলে ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা ও যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্ব পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির ১০ জন সদস্যের মধ্যে তিনজনকে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। একইভাবে জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির ১৩ জন সদস্যের মধ্যে তিনজনকে রাজনৈতিক বিবেচনায় মনোনীত করার অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের মতে, কমিটিতে রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হলে যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যবসায়ীদের ডিলারশিপ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। এতে সার বিতরণব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ বণ্টনের অভিযোগ
বিভিন্ন উপজেলা থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও অভিযোগ করেন, সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও নেতারা নিজেদের মধ্যে ডিলার নিয়োগের সংখ্যা ভাগ করে নিয়েছেন। তাঁর দাবি, নির্ধারিত ভাগ অনুযায়ী অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ বণ্টন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও আত্মীয়তার ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ করা হলে কৃষক ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। সার বিতরণে অনিয়মের প্রভাব শেষ পর্যন্ত কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের স্বার্থেও পড়তে পারে।
তবে ব্রিফিংয়ে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তির দাবি
সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির বক্তব্য, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
কৃষকের কাছে সময়মতো ও ন্যায্য উপায়ে সার পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করতে ডিলার নিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দলটি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফল জানা গেলে সার ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

























