রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কানাডার প্রতিমন্ত্রীর আলোচনা
- আপডেট সময় : ০১:৩৩:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৬১ বার পড়া হয়েছে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাইয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। সোমবার (১২ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাংলাদেশ ও কানাডার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, জ্বালানি নিরাপত্তা, কারিগরি শিক্ষা, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু অর্থায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে কানাডার সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় কানাডার সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশ কানাডার মতো বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে। দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও কার্যকর অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বৈঠকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘদিনের অবস্থান দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে হওয়ায় এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।
কানাডার প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাই রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের গুরুত্বের বিষয়ে একমত পোষণ করেন।
তেল ও এলএনজি সরবরাহে সহযোগিতার আগ্রহ কানাডার
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে কানাডা। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের ক্ষেত্রে কানাডা বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় অংশীদার হতে পারে বলে বৈঠকে জানানো হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার কথা জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করে কানাডা। এ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি নার্সিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং দক্ষ নার্স তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশে নার্সিং প্রশিক্ষণ খাতে কানাডার বিদ্যমান কার্যক্রম রয়েছে। ভবিষ্যতে এ সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে দেশটির।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা
বাংলাদেশের কৃষি খাতে ডাল ও তৈলবীজের উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে কানাডা।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের (সিমিট) মাধ্যমে বাংলাদেশে চলমান কার্যক্রমের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের কৃষক কার্ড কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকদের কাছে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সার, বীজসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মাধ্যমে কৃষকদের তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি কৃষি খাতে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সরকারি সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।
তথ্য ব্যবস্থাপনা ও উপাত্তভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নে কানাডার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সহযোগিতা পেতে পারে বলেও বৈঠকে আলোচনা হয়।
ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য বিমোচনের সম্ভাবনা
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একত্রিত করে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলোর লক্ষ্য নির্ধারণ আরও কার্যকর করা সম্ভব। এর সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা সম্ভব বলে বিশ্বব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পাশাপাশি মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে তাঁদের স্বনির্ভর করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
জলবায়ু অর্থায়নে ১ হাজার ৩০০ কোটি কানাডীয় ডলারের পরিকল্পনা
বৈঠকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খাল খনন এবং ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়।
কানাডার প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু অর্থায়নে ১ হাজার ৩০০ কোটি কানাডীয় ডলার দেওয়ার বিষয়ে তাঁর দেশের আগ্রহ রয়েছে। এ অর্থায়ন থেকে বাংলাদেশের উপকৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করে কানাডা।
বাংলাদেশি-কানাডীয়দের প্রশংসা, প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আমন্ত্রণ
বৈঠকে কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয়দের উদ্যোগ, কর্মদক্ষতা এবং ইতিবাচক মানসিকতার প্রশংসা করেন রণদীপ সরাই। তিনি জানান, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দুই ব্যক্তি কানাডার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কানাডা সফরের আমন্ত্রণ জানান দেশটির আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদি আমিন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কানাডার পক্ষে ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির হাইকমিশনার অজিত সিংসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।




















