শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর কথা ভাবছে ভারত: দীনেশ ত্রিবেদী
- আপডেট সময় : ০৩:২৮:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৫৩ বার পড়া হয়েছে
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতে একটি আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তবে সেই প্রক্রিয়া শেষ করে তাকে কবে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।
শনিবার ‘বে অব বেঙ্গল কনভার্সেশন ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড বলরুমে অনুষ্ঠিত এক সেশনে প্রশ্নের জবাবে ভারতের হাইকমিশনার এসব কথা বলেন।
দীনেশ ত্রিবেদী জানান, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইতোমধ্যে দেশটির অবস্থান একাধিকবার স্পষ্ট করেছেন। বিষয়টি বর্তমানে একটি আইনগত ও সুসংগঠিত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে আদালতও সম্পৃক্ত রয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই
শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানতে চাইলে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বিষয়টি যেহেতু আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে, তাই এ মুহূর্তে কোনো নির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে যে অবস্থান জানিয়েছে, সেটিই ভারতের বর্তমান অবস্থান। একটি নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া আইনগত ও সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আদালতও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে।
ফলে প্রক্রিয়াটি কখন শেষ হবে বা কখন শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে, তা নিয়ে এখনই কোনো সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
একই প্রসঙ্গে ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ভারতে অবস্থান এবং তাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়েও প্রশ্ন করা হলে দীনেশ ত্রিবেদী একই ধরনের অবস্থানের কথা জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের বিষয়েও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
যে পরিস্থিতিতে ভারতে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা
শেখ হাসিনা কীভাবে ভারতে গিয়েছিলেন, সে বিষয়েও কথা বলেন ভারতের হাইকমিশনার। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে ভারতীয় বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়নি। বাংলাদেশে সে সময় যে মর্মান্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি ভারতে এসেছিলেন।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ওই সময় একটি সামরিক বিমান ভারতে এসেছিল। ভারতও এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। তিনি নিজেও সে সময় টেলিভিশনে পরিস্থিতি দেখছিলেন।
তার ভাষ্য, টেলিভিশনের স্ক্রলে তখন শেখ হাসিনা অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন বলে খবর প্রচার করা হচ্ছিল। সেই মুহূর্তে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ফলে পরিস্থিতির বাস্তবতায় ভারতের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না।
তিনি বলেন, একজন প্রতিবেশী হিসেবে তখনকার বাস্তবতাকে গ্রহণ করাই ভারতের দায়িত্ব ছিল। কারণ কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যার জন্য কোনো দেশই আগে থেকে প্রস্তুত থাকে না।
ভারত যদি সে সময় শেখ হাসিনাকে গ্রহণ না করত বা বিমান অবতরণের অনুমতি না দিত, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, তা বলা কঠিন ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দীনেশ ত্রিবেদীর মতে, সেটিই ছিল ওই সময়ের ঐতিহাসিক বাস্তবতা। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন এবং শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে যে আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে, সেটি নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলছে।
বাংলাদেশকে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে হবে
বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ভারতের হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। নিজেদের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি বাংলাদেশ অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে ভালো বুঝবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের কী করা উচিত, তা অন্য কোনো দেশকে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ নিজেদের স্বার্থ এবং নিরাপত্তা নিয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপের প্রশ্নই আসে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের ওপর ভারতের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষও বুঝবেন যে ভারতের নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপের বিষয়টি কখনোই সামনে আসা উচিত নয়।
দীনেশ ত্রিবেদী আরও বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরস্পরের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে সম্মান করা গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক
বাংলাদেশ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক বজায় রাখবে, সেটি বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন ভারতের হাইকমিশনার।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না। বাংলাদেশ তার জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার অধিকার রাখে।
একইভাবে ভারতেরও নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অধিকার রয়েছে। তবে একজন ভালো প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের উচিত পরস্পরের মর্যাদা ও সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে কেবল লেনদেনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই সম্পর্কের পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ জড়িয়ে রয়েছে।
সাংস্কৃতিক বন্ধনের ওপর গুরুত্ব
ভারত-বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলের মানুষ হিসেবে তিনি দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন ভালোভাবেই বোঝেন।
তার মতে, দুই দেশের মধ্যে যে সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে, তা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মৌলিক। বাইরের বিশ্বের পক্ষে ভারত-বাংলাদেশের এই সম্পর্কের গভীরতা পুরোপুরি বোঝা কঠিন।
তিনি নজরুলগীতি ও রবীন্দ্রসংগীতের উদাহরণ দিয়ে বলেন, দুই দেশের মানুষের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বহু পুরোনো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুই দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা হওয়াও এই সম্পর্কের অনন্য দিক তুলে ধরে।
তার বক্তব্য, এ ধরনের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক যোগসূত্র দুই দেশের সম্পর্ককে অন্য অনেক সম্পর্কের তুলনায় আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
নিরাপত্তা ও লেনদেনের সম্পর্ক এক নয়
ভারত-বাংলাদেশের নিরাপত্তা সম্পর্ক এবং পারস্পরিক লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক এক বিষয় নয় বলেও মন্তব্য করেন দীনেশ ত্রিবেদী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ অত্যন্ত বুদ্ধিমান। তারা ভারতের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বোঝেন। তাই ভবিষ্যতে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন না, যেখানে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উদ্বেগের কারণ সৃষ্টি হবে।
দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও এর পাশাপাশি অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মতপার্থক্য থাকলেও সংলাপের বিকল্প নেই
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন ভারতের হাইকমিশনার।
তিনি বলেন, একটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও কখনো কখনো সমস্যা বা মতপার্থক্য দেখা দেয়। একইভাবে দুই দেশের সম্পর্কেও কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক।
তার মতে, কোনো সমস্যা বা মতপার্থক্য না থাকলেই একটি সম্পর্ক গণতান্ত্রিক—এমন নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে মতপার্থক্য থাকবেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেই মতপার্থক্য কীভাবে সমাধান করা হচ্ছে।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হলো সংলাপ, আলোচনা, পরামর্শ এবং পারস্পরিক যোগাযোগ। আর এই সংলাপের মূল ভিত্তি হচ্ছে আস্থা।
তিনি আরও বলেন, একে অপরের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে কোনো সম্পর্কের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।
সম্পর্কের ভিত্তি অটুট থাকার প্রত্যাশা
দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বিষয়টিও তুলে ধরেন দীনেশ ত্রিবেদী।
তিনি বলেন, ভারত-বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে যোগাযোগ ও আন্তরিকতা রয়েছে, সেটি তিনি দেখতে পাচ্ছেন। এ কারণে দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি অটুট রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
তার বক্তব্যে উঠে আসে, রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক পর্যায়ে কোনো কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও জনগণের মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক দুই দেশের বন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের হাইকমিশনারের বক্তব্যে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে সেই প্রক্রিয়া কখন শেষ হবে বা শেখ হাসিনাকে ঠিক কবে ফেরত পাঠানো হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।

























