০২:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

শিক্ষার্থীদের বাকি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু দোকানি নিঃস্ব

এস. এ টিভি
  • আপডেট সময় : ০৪:৫৬:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ নভেম্বর ২০২২
  • / ১৮৪৮ বার পড়া হয়েছে

ছবি- সংগৃহীত

এস. এ টিভি সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দোকানে অনেক শিক্ষার্থী বাকিতে কেনাকাটা করে বা খেয়ে টাকা না দেয়ায় অনেকে ভয়ানক বিপদে পড়ছেন৷ পুঁজি শেষ হয়ে যাওয়ায় নিরুপায় হয়ে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে৷

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অলিম উদ্দীন নামে একজন দোকানি ৩৪ বছর ব্যবসা করার পর নিঃস্ব হয়ে শূন্য হাতে গ্রামে ফিরে গেছেন৷ আলোড়ন সৃষ্টি করা এ খবরের সূত্র ধরে ডয়চে ভেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দোকানগুলোর অবস্থা জানার চেষ্টা করেছে৷ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ দোকান মালিকেরই দাবি- পণ্য বিক্রি করে টাকা না পাওয়ায় তাদের অবস্থা শোচনীয়!

করোনা মহামারির পর অনেক দোকানিই আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরেননি৷ দোকান খোলার মতো পুঁজি নেই তাদের৷ করোনার আগে শিক্ষার্থীদের কাছে যে টাকা পাওনা হয়েছিল সেই টাকাও পাচ্ছেন না৷ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমীর আলী হলের সামনে ৪১ বছর ধরে সোহেল স্টোর নামে একটি দোকান চালাচ্ছেন সাইফুল ইসলাম৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘আমীর আলী, লতিফ ও শাহ মাখদুম হল চত্ত¡রে ২০টির মতো দোকান ছিল৷ করোনার পর মাত্র ৬টি দোকান তারা খুলেছেন৷ অন্যরা পুঁজির অভাবে দোকানগুলো খুলতে পারছেন না৷’’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ৩৪ বছর ধরে ‘প্রয়াস’ নামে একটি খাবারের হোটেল চালিয়েছেন অলিম উদ্দীন৷ গত ৩১ অক্টোবর তিনি দোকান বিক্রি করে দিয়ে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন৷ বর্তমানে গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে আছেন৷ তার দোকানটি যিনি কিনেছেন তিনি এখন নাম দিয়েছেন ‘শাহজালাল হোটেল’৷

মুদির দোকান
করোনার পর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লতিফ হলের এই দোকানটি আর খোলেনি

৩৪ বছরের ব্যবসা বন্ধ করে বাড়ি ফেরার কারণ জানতে চাইলে ডয়চে ভেলেকে টেলিফোনে অলিম উদ্দীন বলেন, ‘‘করোনার আগেই বাকি পড়েছিল ৬ লাখ টাকার মতো৷ মালিকের কাছে অগ্রিম হিসেবে দেওয়া দুই লাখ টাকা ফেরত চাইলে তিনি দুই বছরের ভাড়া হিসেবে ৬৯ হাজার টাকা কেটে ১ লাখ ৩১ হাজার টাকা ফেরত দেন৷ পরে আবার ৩১ হাজার টাকা কেটে রাখেন৷ বাকি এক লাখ টাকা দিয়ে আর দোকান চালাতে পারিনি, কারণ, আমার কাছেও মানুষ দেড় লাখ টাকার মতো পাবে৷ যাদের কাছে বাকি আছে চাইলেও তারা টাকা দিচ্ছে না৷’’

বাকি কারা বেশি খেয়েছে জানতে চাইলে অলিম উদ্দীন বলেন, ‘‘সাধারণ ছাত্রদের কাছে কিছু বাকি আছে৷ কিন্তু বেশি বাকি হল ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যারা থাকে, জুনিয়র নেতা, তাদের কাছে৷ এখন বাড়িতে আসার পর ৩০ হাজার টাকার মতো বিকাশের মাধ্যমে পেয়েছি৷ অনেকেই ফোন করছে৷ কিন্তু টাকা তেমন আসছে না৷’’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাউল হলের সাবেক ডাইনিং ম্যানেজার ইকবাল হোসেন৷ ৫ বছর তিনি ডাইনিং চালিয়েছেন৷ শিক্ষার্থীদের কাছে তার পাওনা ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা৷ ইকবাল হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও টাকা উদ্ধার করতে না পেরে কয়েকদিন আগে ডাইনিংয়ের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছি৷’’ এ এফ রহমান হলের ক্যাফেটোরিয়ার ম্যানেজার হেলাল উদ্দিন গত ২০ অক্টোবর ক্যাশ টেবিলের উপর একটি সাদা কাগজে লিখে রেখেছিলেন ‘দয়া করে সকলে নগদ খান, আমি বাজার করতে পারি না’৷ হেলাল উদ্দিন জানালেন, ‘‘দুই দিন কাগজটি রেখেছিলাম৷ সবাই অনুরোধ করলো ওটা তুলে ফেলতে, তাই পরে সরিয়ে ফেলেছি৷ আসলে বাকি এত বেশি হয়ে গেছে যে, দৈনিক বাজার করাটাই কঠিন হয়ে গেছে৷’’ গত জানুয়ারি মাসে কলা অনুষদের পাশে ‘নাজিম স্টোরে’র মালিক নাজিম উদ্দিন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে লিখেছিলেন, ‘‘বাকির কারণে ব্যবসা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে আমার৷’’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আখতার হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমার একটা মুদি দোকান আছে৷ আমার নিজের বাকিও ৫-৬ লাখ টাকার কম না৷ শুধু শিক্ষার্থী না, শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও আমার কাছ থেকে বাকি নেন৷ শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যেহেতু এখানে থাকেন, ফলে তাদের টাকা উদ্ধার হবে৷ কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছে বাকির কারণে ক্যাম্পাসে দোকান চালানো দুরূহ হয়ে পড়ছে৷ বাকির ভারে অলি ভাইকে শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পাস ছেড়েই চলে যেতে হয়েছে৷ তার মতো আরো ৫-৬ জন আমাকে জানিয়েছেন, তারাও আর চালাতে পারছেন না৷ দোকান বন্ধ করে দেবেন৷’’

মুদির দোকান
রাজশাহী শ্বিবিদ্যালয়ের মাদার বখশ ও সোহরাওয়ার্দী হলের মাঝখানে দোকান

গত বছরের মার্চে বাকিতে সিগারেট না দেওয়ায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহণ মার্কেটের ক্যাম্পাস ফুড কর্নারের মালিক শাহ আলমকে মারধর করেন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী৷ ক্যাম্পাসে বাকির অবস্থা কী জানতে চাইলে সোহেল স্টোরের মালিক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘‘করোনার পর জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে৷ ছাত্রদের কাছে টাকা না থাকায় বিক্রিও কমে গেছে৷ তার মধ্যে যদি ফাও চলে যায়, তাহলে তো দোকানদারি করাই মুশকিল৷ এমনিতে বাকির ভারে জর্জরিত৷ ফলে দোকান চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে৷’’

রাজশাহী শ্বিবিদ্যালয়ের মাদার বখশ ও সোহরাওয়ার্দী হলের মাঝখানে ১৪ বছর ধরে হোটেল চালান মো. হাবিবুর রহমান৷ ব্যবসার অবস্থা জানাতে গিয়ে ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘আমার দোকানে কোনো বাকির খাতা নেই৷ আমি নগদে বিক্রি করি৷ আর যে বাকির কথা বলে সেটা আমি ফাও হিসেবে ছেড়ে দেই৷ ছাত্রনেতারা তো জিলাপি-সিঙ্গাড়া খেয়ে চলে যায়, সেটা আমি ফাও হিসেবেই ধরে নেই৷ কারণ, এসব বাকি কখনও উদ্ধার হয় না৷ ফলে আমি বাকি বলে কিছু রাখিনি৷” কেমন ফাও দিয়ে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘সেটা তো দিতেই হয়, খুব বেশি না৷ দোকানদারি করে চালানটা বাঁচে আরকি৷ সবারই এখন পুঁজির সমস্যা৷ অধিকাংশ দোকারদারই করোনার পর আর ক্যাম্পানে ফেরেনি৷’’

বাকিতে খেয়ে টাকা না দেয়ার প্রবণতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও কি একই রকম? মধুর ক্যান্টিনের মালিক অরুন দে তার অবস্থা জানালেন এভাবে, ‘‘এই মুহূর্তে আমার বাকি ৫০ হাজার টাকার মতো৷ সবসময় এমনই থাকে৷ কিন্তু আমাদের কাছে বাকি রেখে ক্যাম্পাস ছেড়েছে বহু ছাত্র, ছাত্রনেতা৷ তাদের অনেকেই এখন বড় অবস্থানে আছে৷ অনেকে ফিরে এসেও টাকা দিয়ে গেছে৷ এভাবেই আমরা যুগ যুগ ধরে ব্যবসা করে যাচ্ছি৷ বাকি আমাদের জন্য খুব একটা সমস্যা না৷ কিছু বাকি, কিছু ফাও এসব মিলেই আমরা ব্যবসা করি৷ আমাদের মূল সমস্যা হলো, মধুর ক্যান্টিনের সংস্কার করা প্রয়োজন৷ বারবার বলার পরও প্রশাসন এটা করে দিচ্ছে না৷’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাত্তর হলের সাবেক ক্যান্টিন ম্যানেজার মো. সোহেল৷ ৫ বছর ক্যান্টিন চালানোর পর গত মাসে ছেড়ে দিয়েছেন৷ ডয়চে ভেলেকে সোহেল বলেন, ‘‘২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা আমার বাকি৷ ১২ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলাম৷ এখন শূন্য হাতে ক্যান্টিনের দায়িত্ব ছেড়ে দিলাম৷ কারণ, আর বাজার করে খাওয়াতে পারছিলাম না৷ যাদের কাছে টাকা পাবো বারবার তাদের বলেছি, কিন্তু টাকা দেয়নি৷’’ কাদের কাছে এই বাকি? সোহেল বলেন, ‘‘সাধারণ ছাত্রও আছে, ছাত্র নেতাও আছে৷ সবচেয়ে বেশি হলো যারা নেতাদের পেছনে পেছনে ঘোরে তাদের কাছে৷ ওরা নিজেদের খুব পাওয়ারফুল মনে করে৷ অনেকের কাছেই বিষয়টি বলেছি, কিন্তু কেউ সমাধান দেয়নি৷’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসিম উদ্দিন হলের সামনে ২০০৩ সাল থেকে দোকান চালান সোহেল মাহমুদ৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘আমার বাকি ৪০ হাজার টাকার মতো৷ গত ১৯ বছরে বাকি নিয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে গেছে বহু ছাত্র৷ সেই টাকার পরিমাণ ৪ লাখের কম হবে না৷ দোকান ভাড়া দিতে হয়, জিনিসপত্রের দামও বেশি৷ কিন্তু আমরা তো ছাত্রদের কাছ থেকে বেশি দাম নিতে পারি না৷ ফলে আমাদের পক্ষে দোকান চালানোই কঠিন হয়ে গেছে৷’’ ছাত্রনেতাদের সম্পর্কে জানতে চাইলে সোহেল বলেন, ‘‘আপনারা তো সবই বুঝতে পারেন কারা বেশি বাকি খায়৷ এসব বলে আবার কোন বিপদে পড়ি৷ তবে সবকিছু মিলিয়ে আমাদের দিন দিন দোকান চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে৷’’

বাকিতে কেনাকাটা বা খাওয়া নতুন কোনো প্রবণতা নয়৷ তবে এখন বিষয়টি কেন কোনো কোনো দোকান মালিকের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করছে? এ প্রসঙ্গে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমি ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে বলবো না৷ কিছু ছাত্রনেতার যদি নৈতিক অবক্ষয় হয় সেটা ভালো না৷ এখনও অনেক সংগঠনই আছে, যাদের নেতাদের বিরুদ্ধে আপনি কোনো অভিযোগ করতে পারবেন না৷ ছাত্র ইউনিয়নের কোনো নেতা কি কোনো দোকান থেকে বাকি খেয়েছে বা ফাও খেয়েছে সেটা বলতে পারবেন? পারবেন না৷ কেউ যদি এমনটা করে থাকে, সেটা ঠিক করেনি৷ আমাদের সময় এমন অভিযোগ কেউ করতে পারেনি৷’’

এস. এ টিভি সমন্ধে

SATV (South Asian Television) is a privately owned ‘infotainment’ television channel in Bangladesh. It is the first ever station in Bangladesh using both HD and 3G Technology. The channel is owned by SA Group, one of the largest transportation and real estate groups of the country. SATV is the first channel to bring ‘Idol’ franchise in Bangladesh through Bangladeshi Idol.

গুরুত্বপূর্ণ লিংক সমুহ


Warning: Attempt to read property "post_status" on null in /home/satv/public_html/wp-admin/includes/template.php on line 2309

Warning: Attempt to read property "post_status" on null in /home/satv/public_html/wp-admin/includes/template.php on line 2313

Warning: Attempt to read property "post_status" on null in /home/satv/public_html/wp-admin/includes/template.php on line 2319

Warning: Attempt to read property "post_status" on null in /home/satv/public_html/wp-admin/includes/template.php on line 2323

Warning: Attempt to read property "ID" on null in /home/satv/public_html/wp-admin/includes/template.php on line 2327

Warning: Attempt to read property "post_status" on null in /home/satv/public_html/wp-admin/includes/template.php on line 2331

Warning: Attempt to read property "ID" on null in /home/satv/public_html/wp-admin/includes/template.php on line 2345

যোগাযোগ

বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬,
গুলশান-১, ঢাকা-১২১২,
বাংলাদেশ।
ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০
ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪
ই-মেইল: info@satv.tv
ওয়েবসাইট: www.satv.tv

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৩। বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ। ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০, ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

শিক্ষার্থীদের বাকি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু দোকানি নিঃস্ব

আপডেট সময় : ০৪:৫৬:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ নভেম্বর ২০২২

বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দোকানে অনেক শিক্ষার্থী বাকিতে কেনাকাটা করে বা খেয়ে টাকা না দেয়ায় অনেকে ভয়ানক বিপদে পড়ছেন৷ পুঁজি শেষ হয়ে যাওয়ায় নিরুপায় হয়ে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে৷

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অলিম উদ্দীন নামে একজন দোকানি ৩৪ বছর ব্যবসা করার পর নিঃস্ব হয়ে শূন্য হাতে গ্রামে ফিরে গেছেন৷ আলোড়ন সৃষ্টি করা এ খবরের সূত্র ধরে ডয়চে ভেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দোকানগুলোর অবস্থা জানার চেষ্টা করেছে৷ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ দোকান মালিকেরই দাবি- পণ্য বিক্রি করে টাকা না পাওয়ায় তাদের অবস্থা শোচনীয়!

করোনা মহামারির পর অনেক দোকানিই আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরেননি৷ দোকান খোলার মতো পুঁজি নেই তাদের৷ করোনার আগে শিক্ষার্থীদের কাছে যে টাকা পাওনা হয়েছিল সেই টাকাও পাচ্ছেন না৷ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমীর আলী হলের সামনে ৪১ বছর ধরে সোহেল স্টোর নামে একটি দোকান চালাচ্ছেন সাইফুল ইসলাম৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘আমীর আলী, লতিফ ও শাহ মাখদুম হল চত্ত¡রে ২০টির মতো দোকান ছিল৷ করোনার পর মাত্র ৬টি দোকান তারা খুলেছেন৷ অন্যরা পুঁজির অভাবে দোকানগুলো খুলতে পারছেন না৷’’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ৩৪ বছর ধরে ‘প্রয়াস’ নামে একটি খাবারের হোটেল চালিয়েছেন অলিম উদ্দীন৷ গত ৩১ অক্টোবর তিনি দোকান বিক্রি করে দিয়ে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন৷ বর্তমানে গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে আছেন৷ তার দোকানটি যিনি কিনেছেন তিনি এখন নাম দিয়েছেন ‘শাহজালাল হোটেল’৷

মুদির দোকান
করোনার পর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লতিফ হলের এই দোকানটি আর খোলেনি

৩৪ বছরের ব্যবসা বন্ধ করে বাড়ি ফেরার কারণ জানতে চাইলে ডয়চে ভেলেকে টেলিফোনে অলিম উদ্দীন বলেন, ‘‘করোনার আগেই বাকি পড়েছিল ৬ লাখ টাকার মতো৷ মালিকের কাছে অগ্রিম হিসেবে দেওয়া দুই লাখ টাকা ফেরত চাইলে তিনি দুই বছরের ভাড়া হিসেবে ৬৯ হাজার টাকা কেটে ১ লাখ ৩১ হাজার টাকা ফেরত দেন৷ পরে আবার ৩১ হাজার টাকা কেটে রাখেন৷ বাকি এক লাখ টাকা দিয়ে আর দোকান চালাতে পারিনি, কারণ, আমার কাছেও মানুষ দেড় লাখ টাকার মতো পাবে৷ যাদের কাছে বাকি আছে চাইলেও তারা টাকা দিচ্ছে না৷’’

বাকি কারা বেশি খেয়েছে জানতে চাইলে অলিম উদ্দীন বলেন, ‘‘সাধারণ ছাত্রদের কাছে কিছু বাকি আছে৷ কিন্তু বেশি বাকি হল ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যারা থাকে, জুনিয়র নেতা, তাদের কাছে৷ এখন বাড়িতে আসার পর ৩০ হাজার টাকার মতো বিকাশের মাধ্যমে পেয়েছি৷ অনেকেই ফোন করছে৷ কিন্তু টাকা তেমন আসছে না৷’’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাউল হলের সাবেক ডাইনিং ম্যানেজার ইকবাল হোসেন৷ ৫ বছর তিনি ডাইনিং চালিয়েছেন৷ শিক্ষার্থীদের কাছে তার পাওনা ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা৷ ইকবাল হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও টাকা উদ্ধার করতে না পেরে কয়েকদিন আগে ডাইনিংয়ের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছি৷’’ এ এফ রহমান হলের ক্যাফেটোরিয়ার ম্যানেজার হেলাল উদ্দিন গত ২০ অক্টোবর ক্যাশ টেবিলের উপর একটি সাদা কাগজে লিখে রেখেছিলেন ‘দয়া করে সকলে নগদ খান, আমি বাজার করতে পারি না’৷ হেলাল উদ্দিন জানালেন, ‘‘দুই দিন কাগজটি রেখেছিলাম৷ সবাই অনুরোধ করলো ওটা তুলে ফেলতে, তাই পরে সরিয়ে ফেলেছি৷ আসলে বাকি এত বেশি হয়ে গেছে যে, দৈনিক বাজার করাটাই কঠিন হয়ে গেছে৷’’ গত জানুয়ারি মাসে কলা অনুষদের পাশে ‘নাজিম স্টোরে’র মালিক নাজিম উদ্দিন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে লিখেছিলেন, ‘‘বাকির কারণে ব্যবসা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে আমার৷’’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আখতার হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমার একটা মুদি দোকান আছে৷ আমার নিজের বাকিও ৫-৬ লাখ টাকার কম না৷ শুধু শিক্ষার্থী না, শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও আমার কাছ থেকে বাকি নেন৷ শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যেহেতু এখানে থাকেন, ফলে তাদের টাকা উদ্ধার হবে৷ কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছে বাকির কারণে ক্যাম্পাসে দোকান চালানো দুরূহ হয়ে পড়ছে৷ বাকির ভারে অলি ভাইকে শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পাস ছেড়েই চলে যেতে হয়েছে৷ তার মতো আরো ৫-৬ জন আমাকে জানিয়েছেন, তারাও আর চালাতে পারছেন না৷ দোকান বন্ধ করে দেবেন৷’’

মুদির দোকান
রাজশাহী শ্বিবিদ্যালয়ের মাদার বখশ ও সোহরাওয়ার্দী হলের মাঝখানে দোকান

গত বছরের মার্চে বাকিতে সিগারেট না দেওয়ায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহণ মার্কেটের ক্যাম্পাস ফুড কর্নারের মালিক শাহ আলমকে মারধর করেন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী৷ ক্যাম্পাসে বাকির অবস্থা কী জানতে চাইলে সোহেল স্টোরের মালিক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘‘করোনার পর জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে৷ ছাত্রদের কাছে টাকা না থাকায় বিক্রিও কমে গেছে৷ তার মধ্যে যদি ফাও চলে যায়, তাহলে তো দোকানদারি করাই মুশকিল৷ এমনিতে বাকির ভারে জর্জরিত৷ ফলে দোকান চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে৷’’

রাজশাহী শ্বিবিদ্যালয়ের মাদার বখশ ও সোহরাওয়ার্দী হলের মাঝখানে ১৪ বছর ধরে হোটেল চালান মো. হাবিবুর রহমান৷ ব্যবসার অবস্থা জানাতে গিয়ে ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘আমার দোকানে কোনো বাকির খাতা নেই৷ আমি নগদে বিক্রি করি৷ আর যে বাকির কথা বলে সেটা আমি ফাও হিসেবে ছেড়ে দেই৷ ছাত্রনেতারা তো জিলাপি-সিঙ্গাড়া খেয়ে চলে যায়, সেটা আমি ফাও হিসেবেই ধরে নেই৷ কারণ, এসব বাকি কখনও উদ্ধার হয় না৷ ফলে আমি বাকি বলে কিছু রাখিনি৷” কেমন ফাও দিয়ে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘সেটা তো দিতেই হয়, খুব বেশি না৷ দোকানদারি করে চালানটা বাঁচে আরকি৷ সবারই এখন পুঁজির সমস্যা৷ অধিকাংশ দোকারদারই করোনার পর আর ক্যাম্পানে ফেরেনি৷’’

বাকিতে খেয়ে টাকা না দেয়ার প্রবণতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও কি একই রকম? মধুর ক্যান্টিনের মালিক অরুন দে তার অবস্থা জানালেন এভাবে, ‘‘এই মুহূর্তে আমার বাকি ৫০ হাজার টাকার মতো৷ সবসময় এমনই থাকে৷ কিন্তু আমাদের কাছে বাকি রেখে ক্যাম্পাস ছেড়েছে বহু ছাত্র, ছাত্রনেতা৷ তাদের অনেকেই এখন বড় অবস্থানে আছে৷ অনেকে ফিরে এসেও টাকা দিয়ে গেছে৷ এভাবেই আমরা যুগ যুগ ধরে ব্যবসা করে যাচ্ছি৷ বাকি আমাদের জন্য খুব একটা সমস্যা না৷ কিছু বাকি, কিছু ফাও এসব মিলেই আমরা ব্যবসা করি৷ আমাদের মূল সমস্যা হলো, মধুর ক্যান্টিনের সংস্কার করা প্রয়োজন৷ বারবার বলার পরও প্রশাসন এটা করে দিচ্ছে না৷’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাত্তর হলের সাবেক ক্যান্টিন ম্যানেজার মো. সোহেল৷ ৫ বছর ক্যান্টিন চালানোর পর গত মাসে ছেড়ে দিয়েছেন৷ ডয়চে ভেলেকে সোহেল বলেন, ‘‘২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা আমার বাকি৷ ১২ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলাম৷ এখন শূন্য হাতে ক্যান্টিনের দায়িত্ব ছেড়ে দিলাম৷ কারণ, আর বাজার করে খাওয়াতে পারছিলাম না৷ যাদের কাছে টাকা পাবো বারবার তাদের বলেছি, কিন্তু টাকা দেয়নি৷’’ কাদের কাছে এই বাকি? সোহেল বলেন, ‘‘সাধারণ ছাত্রও আছে, ছাত্র নেতাও আছে৷ সবচেয়ে বেশি হলো যারা নেতাদের পেছনে পেছনে ঘোরে তাদের কাছে৷ ওরা নিজেদের খুব পাওয়ারফুল মনে করে৷ অনেকের কাছেই বিষয়টি বলেছি, কিন্তু কেউ সমাধান দেয়নি৷’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসিম উদ্দিন হলের সামনে ২০০৩ সাল থেকে দোকান চালান সোহেল মাহমুদ৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘আমার বাকি ৪০ হাজার টাকার মতো৷ গত ১৯ বছরে বাকি নিয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে গেছে বহু ছাত্র৷ সেই টাকার পরিমাণ ৪ লাখের কম হবে না৷ দোকান ভাড়া দিতে হয়, জিনিসপত্রের দামও বেশি৷ কিন্তু আমরা তো ছাত্রদের কাছ থেকে বেশি দাম নিতে পারি না৷ ফলে আমাদের পক্ষে দোকান চালানোই কঠিন হয়ে গেছে৷’’ ছাত্রনেতাদের সম্পর্কে জানতে চাইলে সোহেল বলেন, ‘‘আপনারা তো সবই বুঝতে পারেন কারা বেশি বাকি খায়৷ এসব বলে আবার কোন বিপদে পড়ি৷ তবে সবকিছু মিলিয়ে আমাদের দিন দিন দোকান চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে৷’’

বাকিতে কেনাকাটা বা খাওয়া নতুন কোনো প্রবণতা নয়৷ তবে এখন বিষয়টি কেন কোনো কোনো দোকান মালিকের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করছে? এ প্রসঙ্গে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমি ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে বলবো না৷ কিছু ছাত্রনেতার যদি নৈতিক অবক্ষয় হয় সেটা ভালো না৷ এখনও অনেক সংগঠনই আছে, যাদের নেতাদের বিরুদ্ধে আপনি কোনো অভিযোগ করতে পারবেন না৷ ছাত্র ইউনিয়নের কোনো নেতা কি কোনো দোকান থেকে বাকি খেয়েছে বা ফাও খেয়েছে সেটা বলতে পারবেন? পারবেন না৷ কেউ যদি এমনটা করে থাকে, সেটা ঠিক করেনি৷ আমাদের সময় এমন অভিযোগ কেউ করতে পারেনি৷’’